“শবে বরাতঃ ছাড়াছাড়ি ও বাড়াবাড়ির মাঝখানে”

 “শবে বরাতঃ ছাড়াছাড়ি ও বাড়াবাড়ির মাঝখানে”

————————————————-

আমি জানি আমার আজকের লেখা আমাদের ঘরানারই অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু সত্য কথাগুলো আপনাদের কাছে পৌঁছানো দরকার৷ কারণ শবে বরাতের পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় পক্ষ থেকেই বাড়াবাড়ি অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।

 

গতকাল রাতে বাংলাদেশের স্বনামধন্য এক তাকফিরি (কথায় কথায় মুসলমানকে কাফির বলা) আলিমের আলোচনা শুনলাম শবে বরাত নিয়ে। এই মানুষটার বাড়াবাড়ি সারাটা জীবন থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি বলছেন, “শবে বরাত না মানলে সে মুনাফিক, বেইমান ও জিন্দিক, সে ইহুদির দালাল!” শবে বরাত না মানলে কেউ জিন্দিক হয়ে যাবে? মুনাফিক, বেইমান ও জিন্দিক তো কাফির মুরতাদের কাছাকাছি।  লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম। কী অবস্থা!  মনে করেছিলাম এই মানুষ শুধরে গেছে। কিন্তু মনে হচ্ছে মুসলমানদেরকে অকারণে কাফির মুরতাদ জিন্দিক বলা ছাড়তে পারবে না ইনি কোনদিনও। আল্লাহ পাক উনাকে হেদায়াত করুন। আমিন।

 

শবে বরাত না  মানলে কোন মুসলমান গোনাহগার হবে। কিন্তু সেজন্য কাফির, মুরতাদ কিংবা জিন্দিক কেন হয়ে যাবে? কুরআন মাজিদের অকাট্যভাবে একক অর্থবোধক  সুস্পষ্ট আয়াত অথবা মুতাওয়াতির হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত কোন বিষয়কে অস্বীকার করলেই কেবল কেউ বেইমান, কাফির, জিন্দিক, মুনাফিক হতে পারে।

 

আর অধিকাংশ সাহাবা, তাবিইন, মুফাসসিরিন, মুজতাহিদ ইমামগণের মতে লাইলাতুম মুবারাকাহ (সূরা দুখানের ৩-৪ নং আয়াতে উল্লেখিত বরকতময় রাত্রি) হচ্ছে কদরের রাত। খুব অল্প কয়েকজন তাবিইন বলেছেন লাইলাতুম মুবারাকাহ মানে শবে বরাত। আআলহামদুলিল্লাহ, আমি অন্তত প্রধান প্রধান ৩০ খানা তাফসিরের কিতাবে এই আয়াতের ব্যাখ্যা দেখে বলছি। আর এই তাকফিরি হুজুর, তিনি লাইলাতুম মুবারাকাহ এর ব্যাখ্যায় শবে কদরের কথা উল্লেখ না করে, অবলীলায় শবে বরাতের রাতে কুরআন মাজিদ নাজিল হয়েছে বলে দিচ্ছেন, তিনি অকাট্যভাবে বলে দিল, লাইলাতুম মুবারাকাহ শবে বরাতের রাত। শবে কদরের কথা একবারও উল্লেখ করেন নাই।  আজব! এগুলো চরল খেয়ানত ও দলবাজী।

 

শবে বরাত তথা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস আছে। অন্তত ৮ জন সাহাবা থেকে ৮ খানা হাদিস শবে বরাতের ব্যাপারে প্রমাণিত। সেগুলোই যথেষ্ট আমাদের জন্য। শাজ (অধিকাংশের বিপরীতে গিয়ে অল্প ২-৩ জনের অভিমত) কওল ও তাফসিরের দিকে যাওয়ার কী প্রয়োজন?

 

ফেস দা পিপল ফেইসবুক পেইজে মুফতি রেজাউল করিম আবরার ভাই গতকাল রাতের ডিবেটে খুব সুন্দর কথা বলেছেন শবে বরাত নিয়ে।  উনারটাই ছাড়াছাড়ি ও বাড়াবাড়ির মাঝের মধ্যমপন্থা। আহলে হাদিস মৌলভিরা যে উসুলে হাদিস ও উসুলে ফিকহের মূলনীতিগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ, তারা যে আসলে সালাফ তথা প্রথম ৩ যুগের মুসলমানদেরকে মানে না বরং তারা যে মূলতঃ খালাফি (অল্প কদিন আগের সৌদি মৌলভী মানা) এবং তাদের মনগড়া  মতবাদ মানানোর জন্য তারা যে ছলচাতুরীর আশ্র‍য় নেয় তা গতকাল সুস্পষ্ট হয়েছে।

 

আমি আবারো ১০০% দাবির সাথে বলছি, শবে বরাতের দলিল হিসেবে অসংখ্য হাদিস আছে (বেশিরভাগেরই সনদ দইফ যা সম্মিলিতভাবে হাসান লি গাইরিহির পর্যায়ে ওঠে,  কিছু হাসান ও সহিহ হাদিসও আছে), সেগুলোই যথেষ্ট এই রাতে নফল আমল করার জন্য, সালাতুত তাসবিহ পড়ার জন্য, কবর জিয়ারত করার জন্য, দোয়া ইস্তিগফার, তাওবা, কুরআন মাজিদের তিলাওয়াত করার জন্য ও এই রাতের গুরুত্ব ও ফজীলত বুঝার জন্য, মানার জন্য। এসব ছেড়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির পথে কেন যেতে হবে?

 

তবে এই রাত্রিতে বিশেষ পদ্ধতির নামাজের কোন দলিল নেই। যার যেভাবে ইচ্ছা যত রাকাত ইচ্ছা নফল নামাজ পড়বে।  এই সূরার পর এই সূরা, এত রাকাত নির্ধারণ করার কোন দরকার নেই, এসবের কোন দলিলও নেই।

 

মানুষকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিন  প্লিজ। যার যত রাকাত ইচ্ছা পড়ুক। যে সূরা দিয়ে ইচ্ছা পড়ুক। আমরা কেউ কেউ নির্দিষ্ট নিয়মের নামাজ ও রাকাত সংখ্যা নিজে থেকে নির্ধারণ করি বলেই আপত্তি আসে৷ এত মনগড়া সিস্টেমের ইবাদাত বানানোর প্রয়োজন কী?

 

এই রাতে বড়ই পাতা দিয়ে গোসল করলে এই হয় সেই হয় এগুলোরও কোন ভিত্তি নেই। কেউ অধিক পবিত্রতা ও ফ্রেশ মনের জন্য গোসল করে ইবাদাত করতে চাইলে করুক৷ কিন্তু এতে আলাদা কোন ফজিলত নেই। কারণ ইবাদাতের সিস্টেম বানানোর অধিকার একমাত্র হুজুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার এবং “এই ইবাদাতে এই সওয়াব, এর ফজিলত এরকম” এসব বলার অধিকারও আল্লাহ পাক ও তাঁর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার।

 

কৃতঃ সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী

Leave a Comment

Your email address will not be published.