শবে বরাত পালনে “ইবাদাত ও সংস্কৃতিঃ ইসলামী দৃষ্টিকোণ”

 “ইবাদাত ও সংস্কৃতিঃ ইসলামী দৃষ্টিকোণ”

ইবাদাত ও সংস্কৃতিঃ ইসলামী দৃষ্টিকোণ

সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারি

আমাদের এই যুগে আমরা বড় একটা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। কোনটা ইবাদাত ও কোনটা এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতি তারমাঝে পার্থক্য ভুলে যাচ্ছি। অনেকেই মনে করেন, ইসলাম মানার অর্থ হলো বাকি সব কালচারাল একটিভিটিস ভুলে যাওয়া। এটা আংশিক সত্য, পুরোপুরি না। যেই এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতি প্রমাণিত ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক সেটা নিঃসন্দেহে পরিত্যাজ্য। কিন্তু যা ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক না তা কেন আমরা ত্যাগ করব? এরকম কোন কালচার ত্যাগ করতে বলার নামই হচ্ছে উগ্রবাদীতা, বাড়াবাড়ি। 

 

উদাহরণস্বরুপ আমরা বলতে পারি, বুখারি শরিফের দুই ঈদের নামাজের অধ্যায়ে আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, ঈদের দিনে কালো বর্ণের মানুষেরা মসজিদে নববীর ভেতরে ঢাল তলোয়ার দিয়ে খেলা করছিলেন। হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, হে আয়েশা! তুমি কী তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। অতঃপর আমি নবি কারিম ﷺর পবিত্র কাঁধ মোবারকের উপর মাথা রেখে তাঁদের খেলা দেখালাম। নবি কারিম ﷺ তাঁদেরকে  উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, “হে বনি আফরিদা! চালিয়ে যাও!” (হাদিস নং- ৯৪৯/৯৫০)

অপর রেওয়ায়াতে এসেছে, হজরত আনাস ইবনে মালিক রাঃ বর্ণনা করেছেন, আবিসিনিয়ার (হাবাশার) লোকেরা বিশেষ এক ধরণের  নৃত্য করছিলেন, খেলা করছিলেন হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺর উপস্থিতিতে। আর মুখে কী যেন বলছিলেন! হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তারা কী বলছে?”  সাহাবায়ে কেরাম বললেন, তাঁরা বলছেন, “মুহাম্মাদুন আব্দুন সালিহ! মুহাম্মাদুন আব্দুন সালিহ!”

“হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নেক বান্দা!  হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নেক বান্দা!” (মুসনাদ আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদিস নং ১২৫৪০, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং-৫৮৭০, মুহাক্কিক মুহাদ্দিসিনগণ বলেছেন, এই হাদিসখানা ইমাম মুসলিম রাহঃ এঁর শর্তানুযায়ী সহিহ)

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবার! হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ আবিসিনিয়ান এই সাহাবাগনের সংস্কৃতিতে কোন বাঁধা তো দেনই নাই, বরং উৎসাহ দিয়েছেন। এমনকি মুসলিম শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে, ওমর রাঃ তাঁদেরকে বাঁধা দিতে যাচ্ছিলেন, নবি কারিম ﷺ বললেন, ও ওমর! তাদেরকে তাদের কাজ করতে দাও! (বুখারি- ২৯০১, মুসলিম  ৮৯৩)

ঠিক একইভাবে হজরত আনাস ইবনে মালিক রাঃ বর্ণনা করেছেন, নবি কারিম ﷺ যখন মদিনা শরিফে আগমন করলেন তখন আবিসিনিয়ানরা খুশিতে আনন্দিত হয়ে ঢাল তলোয়ার দিয়ে খেলা করছিল। (আবু দাউদ-৪৯২৩, মুসনাদ আহমদ -১২৬৪৯)

এগুলো হচ্ছে এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতি। এগুলোতে হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ বাঁধা দেন নাই। কারণ এগুলো ইসলামী শরিয়তের কোন হুকুম আহকামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ঠিক যেভাবে হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺর জন্য সাহাবায়ে কেরাম যে দেশে গিয়েছেন সেই দেশের পোশাকই নিয়ে এসেছেন। নবি কারিম ﷺ কারো কাপড় ফিরিয়ে দেন নাই। একমাত্র রেশমী ও ছবি আঁকা কাপড় ব্যাতীত। 

উপরোক্ত হাদিসগুলোতে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয়! আবিসিনিয়ান সাহাবি যারা নেচে গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করছিলেন, তাঁদেরকে হাদিসগুলোতে “হাবাশা” বা আবিসিনিয়ান বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা কিন্তু মুসলমান সাহাবা ছিলেন। কেউ বলেন নাই যে, মুসলমানদেরকে আবিসিনিয়ান নামে অন্য জাতিস্বত্তায় বিভক্ত করা যাবে না। তাঁরা মুসলমান, কিন্তু আবিসিনিয়ান। এই বাস্তবতাকে মেনে নেয়া হয়েছে। এখন অনেকেই বলতে চান, বাংগালী বা বাংলাদেশী এই আলাদা জাতিস্বত্তা প্রতিষ্ঠা করা কী জায়েজ? আপনাদের প্রশ্নের উত্তর এই হাদিসেই আছে। ইসলাম বাস্তবতা থেকে দূরে সড়ে যাওয়া কোন ধর্ম না। আমরা মুসলমান এবং বাংগালী/বাংলাদেশী যাই বলেন।

যাইহোক, আমরা এখন এরকম এলাকাভিত্তিক, দেশভিত্তিক সংস্কৃতিগুলোর উপর ধর্মের আলোকে ফতোয়া দিয়ে দিচ্ছি যে, “এগুলো হারাম”। এর কোন প্রয়োজনই নেই। এই সংসস্কৃতিগুলো যদি ইসলামী শরিয়তের কোন ফরজ ওয়াজিব হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে এগুলোর উপরে শরিয়তের হুকুম দেয়া মানে জুলুম করা এবং নবি কারিম ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে দ্বীন বেশি বুঝতে যাওয়া। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। 

যেমন ধরুন, কেউ যদি পহেলা বৈশাখের দিনে ভালো ভালো খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে পরিবার পরিজন ও আত্মীয় স্বজন নিয়ে, একে অপরকে শুভ নববর্ষ বলে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাতে সমস্যা কী? হ্যাঁ, সমস্যা হবে তখন, যখন নারীপুরুষ একসাথে মিলে বেশরিয়তী পন্থায় প্যাঁচা ও হাতির মূর্তি নিয়ে মংগল শুভাযাত্রা করবে, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার উপলক্ষ বানাবে এটাকে। তবে এসব কাজ তো ঈদের দিনে করলেও নাজায়েজ হবে। ঠিক একইভাবে শরিয়তসম্মত পন্থায় ইংরেজি নববর্ষও পালন করতে পারে। শবে বরাতে আমরা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মানুষ ভালো ভালো খাবার খাই, হালুয়া রুটি খাই এবং অপরকে খাওয়াই। এগুলোতে ফতোয়াবাজী করার প্রয়োজন কী? এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অংশ। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে  র‍্যালি হয়, লাইটিং হয়, সাজগোজ হয় এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এগুলো নিয়ে ফতোয়াবাজীর কিছু নেই। এগুলো সরাসরি ইবাদাত নয়, এগুলো সাকাফাত বা সংস্কৃতি যেগুলোর উপরে শরিয়তের হুকুম দেয়া অপ্রয়োজনীয় এবং বাড়াবাড়ি।


TAGS:আমল,ইসলাম,

Leave a Comment

Your email address will not be published.